সাব্বির সুমন, রাজশাহী: প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার। একসময় নির্দিষ্ট আড্ডা বা গোপন আসরে সীমাবদ্ধ থাকা জুয়া এখন স্মার্টফোন, মোবাইল অ্যাপ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। এতে কিশোর-তরুণ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়িয়ে পড়ছেন এই ভয়াবহ আসক্তিতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইন বেটিংয়ে আসক্ত হয়ে অনেকে হারাচ্ছেন জীবনের সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা। বিভিন্ন এলাকায় আত্মহত্যা, পারিবারিক সহিংসতা, ঋণগ্রস্ততা, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বৃদ্ধির পেছনেও অনলাইন জুয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠছে।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বেটিং প্ল্যাটফর্ম ও দেশীয় এজেন্টদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সিকে৪৪৪, সিভি৬৬৬, নগদ৮৮, ক্রিক্রিয়া, ওয়ানএক্সবেট, বাবু৮৮ ও লাইনবেটসহ বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের লেনদেন হচ্ছে। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারের কারণে এই লেনদেন আরও সহজ হয়ে উঠেছে।
এক ব্যবসায়ী জানান, আগে ডলারভিত্তিক সীমিত লেনদেন থাকলেও বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষও সহজেই এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।
এদিকে অনলাইন জুয়ার কারণে এক সরকারি চাকরিজীবীর আত্মহত্যা ও এক কলেজছাত্র হত্যার ঘটনায় স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই ধরনের ঘটনা কক্সবাজার, বগুড়া ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলাতেও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ বেটিং সার্ভার বিদেশে পরিচালিত হওয়ায় মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমান্তবর্তী ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় এলাকাগুলোতে এসব চক্র বেশি সক্রিয় বলেও জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাস্টার এজেন্ট, সাব-এজেন্ট ও লোকাল রিক্রুটদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এই সিন্ডিকেট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, প্রলোভনমূলক অফার এবং ভুয়া সেলিব্রিটি ভিডিও ব্যবহার করে নতুন ব্যবহারকারী আকৃষ্ট করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি সামাজিক অপরাধ, পারিবারিক ভাঙন ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তাদের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় ভূমিকা এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার না করলে অনলাইন জুয়া ভবিষ্যতে দেশের জন্য বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।