বিশেষ প্রতিনিধি: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জহুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রুটিন মেইনটেনেন্স, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রাজশাহী জেলার বাগমারা ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নিজের এলাকার ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে একটি ঘুষ ও কমিশনভিত্তিক সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়। এসব প্রকল্পের কাজ কাগজে-কলমে দেখিয়ে বাস্তবে কাজ না করেই অথবা নিম্নমানের কাজ সম্পন্ন করে কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে পান কুষ্টিয়ার সৈকত এন্টারপ্রাইজ–এর প্রোপাইটার সাহিদা বেগম। তবে বাস্তবে এসব কাজ বাস্তবায়ন করেন নাটোরের ঠিকাদার মোঃ রহমান গাজী। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জহুরুল ইসলাম ও নাটোরের ঠিকাদার মোঃ রহমান গাজীর মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় নিয়মিত রুটিন মেইনটেনেন্স কাজগুলো তার নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প এলাকায় কোনো দৃশ্যমান কাজ না করেই কিংবা নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রকল্প পরিদর্শন ছাড়াই বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাগমারা ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রুটিন মেইনটেনেন্সের নামে কাজ না করেই বিল উত্তোলনের বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে বাগমারা উপজেলা প্রকৌশলী খলিলুর রহমান কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিল প্রস্তুত করতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার মোঃ রহমান গাজী বিল প্রস্তুতের জন্য তাকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাকে হুমকি দেওয়া হয় এবং চাকরি নিয়েও ভয়ভীতি দেখানো হয়।পরবর্তীতে ঠিকাদার মোঃ রহমান গাজী বিষয়টি নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জহুরুল ইসলামের কাছে অভিযোগ করলে বাগমারা উপজেলা প্রকৌশলীর ওপর বিল প্রস্তুতের জন্য চাপ প্রয়োগ শুরু হয়। একপর্যায়ে এ নিয়ে দুজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত অনৈতিক কাজে সহযোগিতা না করায় বাগমারা উপজেলা প্রকৌশলীকে রাজশাহীর বাইরে বদলি করা হয়।
অন্যদিকে, দুর্গাপুর উপজেলা প্রকৌশলী মাসুক-ই-মোহাম্মদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।ঠিকাদার মোঃ রহমান গাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বাগমারা উপজেলা প্রকৌশলী আমার অনেক বড় ক্ষতি করেছে, তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো নয়। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জহুরুল ইসলামের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়েই ফোন কেটে দেন।এদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জহুরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি এখানে চাকরি করতে এসেছি, কারো সঙ্গে শত্রুতা করতে আসিনি।তবে বাগমারা উপজেলা প্রকৌশলীকে বদলির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান।আরও অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় চলমান কাজ পরিদর্শনের সময় নিম্নমানের কাজ চিহ্নিত না করে উপজেলা প্রকৌশলীদের ওপর কমিশনের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উপজেলা প্রকৌশলী জানান, কমিশনের টাকা না দিলে গালাগালি ও হুমকি দেওয়া হতো, এমনকি বেতন থেকে টাকা এনে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
২০২৫ অর্থবছরের জিওপি মেইনটেনেন্স খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর, নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ হাজার টাকা করে কমিশন কেটে রেখে অর্থ বিতরণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে এলজিইডি কার্যালয়ে একাধিকবার উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে এলাকাবাসী, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও সচেতন মহল নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।