নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর পদ্মা নদী থেকে উৎসারিত নবগঙ্গা ও বারাহী নদী দখল ও দূষণমুক্ত করা এবং পুনঃখননের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার দুপুরে রাজশাহীর পবা উপজেলার বারসিক রাজশাহী রিসোর্স সেন্টারের সেমিনার কক্ষে এ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। গ্রিন কোয়ালিশন, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম ও বারসিক যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
বক্তারা বলেন, রাজশাহী নগরের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে নগরসংলগ্ন নদী, বিল ও জলাধার মারাত্মক দূষণ, দখল ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। চরম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এই অঞ্চলে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
দেখা গেছে, নগরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত তরল বর্জ্য প্রবাহিত হয়ে স্বরমঙ্গলা, বারাহী, নবগঙ্গা ও বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। একসময় স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এসব নদীর পানি এখন কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত। তলদেশে পলি ও প্লাস্টিক জমে প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, কমে গেছে মাছসহ জলজ প্রাণীর উপস্থিতি। ফলে স্থানীয় জেলেরা আয় হারাচ্ছেন এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশগত চরিত্র নষ্ট হচ্ছে।
নগরের বিষাক্ত বর্জ্য নিম্নাঞ্চলে জমে সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিল ও কর্ণাহার বিলের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত এসব বিল এখন স্থায়ী জলাবদ্ধতা, মাছের উৎপাদন হ্রাস এবং দূষিত পানি কৃষিজমিতে প্রবেশের ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নিরাপদ খাদ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ দূষিত পানি নিম্নপ্রবাহে নাটোর জেলার চলন বিল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দূষিত পানি দিয়ে চাষাবাদ চলতে থাকায় মাটির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং ফসলে ক্ষতিকর উপাদান জমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চর্মরোগ, পানিবাহিত রোগ ও দুর্গন্ধজনিত শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। মৎস্যজীবী ও কৃষকসহ নিম্নআয়ের মানুষ সরাসরি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, যা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্নও উত্থাপন করছে।
সংগঠনগুলোর মতে, এটি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি বড় সমস্যা। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- পদ্মা থেকে উৎসারিত স্বরমঙ্গলা, বারাহী ও নবগঙ্গা নদী অবিলম্বে দখল-দূষণমুক্ত করা; রাজশাহী নগরে আধুনিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন ও কার্যকর করা; শিল্প, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নিশ্চিত ও কঠোর মনিটরিং চালু করা; নদী ও সংযুক্ত বিলগুলোতে সরাসরি ড্রেন সংযোগ ও দখল বন্ধ করা; দূষণের উৎস শনাক্তে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন ও প্রতিবেদন প্রকাশ; এবং সংশ্লিষ্ট নদী-বিলের পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা। পাশাপাশি নদী-বিল রক্ষায় সমন্বিত পুনরুদ্ধার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহী জেলার আহ্বায়ক মাহবুব সিদ্দিকী, পবা উপজেলার আহ্বায়ক রহিমা খাতুন, বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম এবং বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক বক্তব্য রাখেন।