নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাবের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীবের দায়িত্বকালীন সময়ে এসব নিয়োগকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও প্রশ্ন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের একটি শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। নিয়োগ পরীক্ষায় মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেও বাদ পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এ সালাম। যদিও তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে দুটি স্বর্ণপদক লাভ করেন। তার পরিবর্তে প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানধারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল চূড়ান্ত ফলাফলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়। এ সালাম অভিযোগ করেন, অধিক যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে কম যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা স্পষ্ট বৈষম্য। অভিযোগ অনুযায়ী, অধ্যাপক নকীবের ৫৫৭ দিনের দায়িত্বকালে ১৫টি সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে অন্তত ৪৭৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ১৫৪ জন শিক্ষক, ছয়জন চিকিৎসক, তিনজন কর্মকর্তা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৩১৫ জন কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বড় নিয়োগের ঘটনা বিরল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তার মেয়াদকালের অন্যতম সমালোচিত ঘটনা হলো—এইচএসসি পাস দুই ব্যক্তিকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া। এছাড়া নিজের শ্বশুরকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিভাগে একটি শূন্য পদের বিপরীতে ১০ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নীতিমালার পরিপন্থি বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্স ডিগ্রির শর্ত সংযোজন করায় রাবির শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
শিক্ষক নিয়োগ ত্বরান্বিত করতে উপাচার্যের পক্ষ থেকে একাধিকবার বিভাগগুলোতে চিঠি দিয়ে তাগাদা দেওয়ার ঘটনাও নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা।
কর্মকর্তা নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। জনসংযোগ দপ্তরে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই একজনকে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। আবার স্নাতক সম্পন্নের আগেই একজনকে সহকারী প্রোগ্রামার পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই পদে নিয়োগ পাওয়া আরেকজন পরবর্তীতে সনদপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় তার চাকরি বাতিল করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই একাধিক চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে।
নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে আসে। একটি ফোনালাপের রেকর্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ফরেনসিক পরীক্ষায় সেটি সত্য বলে নিশ্চিত হওয়া গেলেও নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করা হয়নি।
এছাড়া দৈনিক মজুরিভিত্তিক ৩১৫ জন কর্মচারী নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রশাসন তা অস্বীকার করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার পরিবর্তে দলীয় প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি প্রাধান্য পেয়েছে। তারা বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, তার সময়ে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, কিছু নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় মেধাবীরা বঞ্চিত হবে এবং প্রতিষ্ঠানের মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।