রফিকুল ইসলাম,ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি: রাজশাহী মহানগরীতে ফুটপাত দখল আর এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়—এটি ক্রমেই নগর ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণহীন এক অবৈধ দখল নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে। ফুটপাতের পর এবার সরাসরি সড়কই দখল হয়ে যাচ্ছে হকার ও অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। ব্যস্ততম সড়কগুলোর বড় অংশজুড়ে গড়ে উঠেছে ফল, সবজি, চা, ফাস্টফুড ও কাপড়ের অবৈধ স্টল। এতে নগরীতে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং ভেঙে পড়ছে স্বাভাবিক ট্রাফিক শৃঙ্খলা।
সরেজমিনে দেখা যায়,নগরীর ব্যস্ততম মোড় তালাইমারী, বিনোদপুর বাজার, শালবাগান মোড়, নিউমার্কেট, রানীবাজার, হড়গ্রাম কাঁচাবাজার, ভদ্রা মোড়, সাহেব বাজার জিরোপয়েন্ট, লক্ষীপুর মোড়, এলাকায় সড়কের ওপরই স্থায়ী-অস্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। কোথাও রাস্তার অর্ধেক দখল করে ফলের দোকান, কোথাও টিন-পলিথিনে গড়া কাপড়ের দোকান,চা স্টল, আবার কোথাও পাকা দোকানের মতো কাঠামো তৈরি করে ব্যবসা চলছে প্রকাশ্যে।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র সাহেববাজার,তালাইমারী মোড়,বিনোদপুর বাজার ও শালবাগান মোড়ে। শালবাগান মোড়ে অন্তত অর্ধশত ফলের দোকান ফুটপাত ছাড়িয়ে সরাসরি সড়কে বিস্তৃত হয়েছে। এর কিছু অংশ রাজশাহী–নওগাঁ মহাসড়ক পর্যন্ত চলে গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।
এতে যান চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে প্রতিনিয়ত যানজট তৈরি হচ্ছে এবং ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। একজন স্থানীয় দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখন ফুটপাত আর সড়কের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সবাই যেভাবে বসছে, তাতে নিয়ন্ত্রণ নেই। বড় দুর্ঘটনা যে কোনো সময় হতে পারে, কিন্তু কেউ দেখছে না।

সাহেববাজার এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল। সড়কের ওপর পলিথিন, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করে কাপড় ও খাবারের দোকান বসানো হয়েছে। এতে রাস্তার একপাশ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের চাপ বেড়ে গিয়ে প্রতিদিনই সেখানে যান চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। লক্ষীপুর মোড় থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ফুটপাত দখল করে অস্থায়ী খাবারের দোকান বসানো হয়েছে। এতে জরুরি চিকিৎসা সেবাগামী রোগী ও অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রিকশাচালক কামাল বলেন, “আগে যেখানে ১০ মিনিট লাগত, এখন জ্যামের কারণে আধা ঘণ্টা লাগে। দোকানের কারণে রাস্তা সরু হয়ে গেছে। আয়ও কমে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, “বৈধ দোকানদাররা নিয়ম মেনে দোকান দিচ্ছে, অথচ রাস্তা দখল করে যারা ব্যবসা করছে তারা কোনো নিয়ম মানছে না। এতে শহরের শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সড়ক ও ফুটপাত দখল নগর ব্যবস্থাপনার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। জরুরি সেবা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলাচল এবং সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি সফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এটি শুধু নিম্ন আয়ের হকারদের বিষয় নয়।
একটি প্রভাবশালী চক্রও এই দখলের সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।” রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, হকারদের তালিকা তৈরি করে নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ঈদের পর এ কার্যক্রম শুরু হবে। একই সঙ্গে নগরীর যানজট ও দখল সমস্যা সমাধানে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানান।