প্রিন্ট এর তারিখঃ Sep 13, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Sep 1, 2026 ইং
চারঘাটে পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে কোটি কোটি টাকা, জিও ব্যাগেই অনিয়মের অভিযোগ
চারঘাটে পুরোনো বস্তা পুনর্ব্যবহার, মাটিযুক্ত বালু ও কম ওজনের অভিযোগ জব্দ ৩৫০ জিও ব্যাগ শাহিনুর সুজন, স্টাফ রিপোর্টারঃ পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে রাজশাহীর চারঘাটে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিন্তু নদীভাঙনে বিপর্যস্ত মানুষের স্বস্তির বদলে এ প্রকল্প ঘিরেই দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতে ফেলে দেওয়া জিও ব্যাগ কেটে বালু ফেলে খালি বস্তা তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। পরে সেই পুরোনো বস্তাতেই আবার বালু ভরে নদীতে ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্ধারিত ওজনের চেয়ে কম বালু দেওয়া এবং ভালো মানের বালুর পরিবর্তে মাটিযুক্ত বালু ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে ইতোমধ্যে ৩৫০টি পুরোনো জিও ব্যাগ জব্দ করা হয়েছে। বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, ঝুঁকিতে স্কুল-মসজিদ বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই চারঘাট উপজেলার গোপালপুর, চন্দনশহর, পিরোজপুর ও সাহাপুর এলাকায় পদ্মার তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পিরোজপুর এলাকার বসতবাড়ি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মসজিদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর ভাঙন শুরু হলেই জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার জন্য বিশেষ বরাদ্দ আসে। কিন্তু বর্ষা শেষে স্থায়ী নদীশাসন বা প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে একদিকে সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে পরের বছর একই এলাকায় আবারও ভাঙন শুরু হচ্ছে। প্রায় চার কোটি টাকার প্রকল্প পাউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে সাহাপুর ও পিরোজপুর এলাকায় বিশেষ তহবিল থেকে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯ হাজার ২০০টি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়।পরবর্তীতে জরুরি প্রকল্পের আওতা বাড়ানো হয়। বর্তমানে পিরোজপুর এলাকায় ১০টি প্যাকেজে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৫ হাজার জিও ব্যাগ এবং সাহাপুর এলাকায় তিনটি প্যাকেজে ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩ হাজার ৫০০টি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। সব মিলিয়ে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের সামনেও নদীভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। নদীতে ফেলা ব্যাগ আবার তোলার অভিযোগ স্থানীয়দের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, নদীতে ফেলার পর জিও ব্যাগগুলো কেটে বালু বের করে খালি বস্তা পুনরায় সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদের দাবি, একটি নতুন জিও ব্যাগের মূল্য প্রায় ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা। নদী থেকে পুরোনো ব্যাগ তুলে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। পরে ওই বস্তাতেই আবার বালু ভরে নদীতে ফেলা হলে ঠিকাদারের ব্যাগপ্রতি অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা রেন্টু আলী বলেন,অনেকে সারাদিন নদী থেকে জিও ব্যাগ কেটে তুলে বিক্রি করছে। কেউ কেউ দিনে ১৫ থেকে ২০টি ব্যাগ বিক্রি করে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছে। অনেকে আবার নদী থেকে ব্যাগ তুলে বাড়ির বিভিন্ন কাজেও ব্যবহার করছে। পিরোজপুরের বাসিন্দা সান্টু আলী বলেন,নতুন বস্তা নদীতে ফেলার আগে গণনার সময় সবুজ রঙের চিহ্ন দেওয়া হয়। কিন্তু নদীতে আগের চিহ্নযুক্ত পুরোনো বস্তাও ফেলা হচ্ছে। পরে দেখি কিছু লোক নদী থেকে বস্তা কেটে তুলে ঠিকাদারের লোকজনের কাছে বিক্রি করছে। অভিযোগের পর ৩৫০ ব্যাগ জব্দ স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২৬ জুলাই চারঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মীর মেজবাহীজ্জুলাম চৌধুরী অভিযান চালিয়ে ৩৫০টি পুরোনো জিও ব্যাগ জব্দ করেন। পরদিন ২৭ জুলাই বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লিখিতভাবে জানায় উপজেলা প্রশাসন। এ ঘটনায় জিও ব্যাগের ব্যবহার, সরবরাহ ও প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ২৫০-৩০০ কেজির বদলে কম বালু? পাউবোর তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি জিও ব্যাগে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি বালু থাকার কথা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক বস্তায় নির্ধারিত পরিমাণ বালু নেই। সরেজমিনে স্থানীয়দের অভিযোগের সঙ্গে মিল রেখে দেখা গেছে,নতুন বস্তার পাশাপাশি পুরোনো বস্তাতেও বালু ভরে নদীতে ফেলা হচ্ছে। উন্নতমানের মোটা বালুর পরিবর্তে পদ্মার চর থেকে মাটিমিশ্রিত বালু সংগ্রহ করে বস্তায় ভরার অভিযোগও রয়েছে। সাহাপুরের বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন,দরপত্র অনুযায়ী ভালো মানের মোটা বালু ব্যবহার হওয়ার কথা। কিন্তু মাটিযুক্ত বালু ভরে বস্তা ফেলা হচ্ছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই তাড়াহুড়ো করে কাজ শুরু হয়। তখনই বেশি অনিয়ম হয়। ছয় বিঘা জমির দেড় বিঘাই নদীতে গোপালপুর গ্রামের কৃষক বাদশা ইসলাম বলেন,নদীর তীরে ছয় বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছি। ইতিমধ্যে দেড় বিঘা নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন প্রতিদিন বাড়ছে। গত বছরও জরুরি কাজের নামে প্রায় ৮০ লাখ টাকার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এবার আবার একই অবস্থা। নদী থেকে স্কুল মাত্র ৫-১০ মিটার পিরোজপুর (২) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃনূর উদ্দিন শেখ বলেন,যে এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে, সেখানে আমাদের বিদ্যালয় পড়েনি। স্কুল থেকে নদীর দূরত্ব মাত্র ৫ থেকে ১০ মিটার। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে এবার হয়তো স্কুলটি বিলীন হয়ে যাবে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, নদীর তীরবর্তী মাত্র ১০০ বা ১২০ মিটার এলাকায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে কয়েক কিলোমিটার ভাঙনপ্রবণ এলাকা কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব? অরক্ষিত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চারঘাট উপজেলার পদ্মা নদীর তীরবর্তী প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকায় ব্লক দিয়ে নির্মিত প্রতিরক্ষা বাঁধ রয়েছে। তবে আরও প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা এখনো অরক্ষিত। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বাড়লেই এসব এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। তখন জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় ভাঙন পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চারঘাট উপজেলা সভাপতি মোঃকামরুজ্জামান বলেন,প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের মুখে পড়েছে। পুরো ভাঙনপ্রবণ এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন না করলে প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এতে সরকারি অর্থও অপচয় হবে। ঠিকাদারের দাবি, মান ঠিক আছে তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খাজা তারেক এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান। তিনি বলেন,কাজ নির্ধারিত কারিগরি মান অনুসরণ করেই করা হচ্ছে। বালুর মান ও বস্তার ওজনও সঠিক আছে। আমরা পুরোনো জিও ব্যাগ ব্যবহার করিনি। পাউবো: এটি অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা পাউবোর রাজশাহী পওর বিভাগের চারঘাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃআবু রৌশন মাস্উদ বলেন,জিও ব্যাগ ফেলা একটি অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। স্থানীয়দের অনুরোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজটি করা হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি ব্যাগ কেটে বিক্রির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন,আশপাশের এলাকাও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু জিও ব্যাগ ফেলে এখানকার ভাঙন পুরোপুরি রোধ করা যাবে এমনটা নয়। ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা পুরো এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে। তদন্তের আশ্বাস উপজেলা প্রশাসনের চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন,৩৫০টি পুরোনো জিও ব্যাগ জব্দ করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। কাজের মান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। অনিয়মের যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে প্রতিবছর পদ্মার ভাঙনে চারঘাটের মানুষ জমি, ঘরবাড়ি ও স্থাপনা হারাচ্ছেন। ভাঙন ঠেকাতে সরকারি অর্থে নেওয়া হচ্ছে জরুরি প্রকল্প। কিন্তু সেই প্রকল্পের কাজ নিয়েই যদি পুরোনো জিও ব্যাগ পুনর্ব্যবহার, কম বালু ও নিম্নমানের বালু ব্যবহারের মতো অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, নদীভাঙন ঠেকাতে বরাদ্দ করা কোটি কোটি টাকা কি সত্যিই ভাঙন প্রতিরোধে কাজে লাগছে, নাকি প্রতিবছর জরুরি প্রকল্পের নামে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তিই হচ্ছে? স্থানীয়দের দাবি, বর্ষাকেন্দ্রিক অস্থায়ী প্রকল্পের পরিবর্তে শুষ্ক মৌসুমে পুরো ভাঙনপ্রবণ এলাকা সমীক্ষা করে স্থায়ী নদীশাসন ও প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হোক। একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পের বালুর মান, জিও ব্যাগের ওজন, সংখ্যা ও পুনর্ব্যবহারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
দৈনিক রাজশাহীর শীর্ষ সংবাদ |