প্রিন্ট এর তারিখঃ Sep 13, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Sep 10, 2026 ইং
শিশুদের প্রিয় ‘মতিমালা’ওয়ালা দীন মোহাম্মদ: শেষ বয়সে ঠিকানাহীন, একাকী মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক :একসময় রাজশাহী মহানগরীর স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে নগরের প্রায় সর্বত্রই ছিল তাঁর পরিচিত মুখ। বাঁশের লাঠির আগায় ঝুলত শিশুদের প্রিয় মুখরোচক খাবার ‘মতিমালা’। দশ পয়সা, চার আনা কিংবা আট আনায় শিশুদের আবদার অনুযায়ী বানিয়ে দিতেন আংটি, ঘড়ি, সাইকেল, মোটরসাইকেলসহ নানা আকৃতির মতিমালা। উর্দু-বাংলা মেশানো মজার কথাবার্তায় মুহূর্তেই শিশুদের আপনজন হয়ে উঠতেন তিনি। তিনি আর কেউ নন—রাজশাহীর মানুষের কাছে বহুল পরিচিত মতিমালাখ্যাত দীন মোহাম্মদ। তবে লাখো শিশুর মুখে হাসি ফোটানো এই মানুষটির নিজের জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল অত্যন্ত কষ্টের। বার্ধক্য, অসুস্থতা, একাকিত্ব এবং স্বজন হারানোর বেদনা নিয়েই তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজশাহী মহানগরীর শিরোইল কলোনীতে দুই কাঠা জমি ছিল দীন মোহাম্মদের। সেখানে স্ত্রী, চার ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার ছিল তাঁর। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রী-সন্তানরা জমি বিক্রি করে পাকিস্তানে চলে যান। দীন মোহাম্মদ বাংলাদেশ ছাড়েননি। এরপরই শুরু হয় তাঁর একাকী জীবন। পরবর্তীতে সুহৃদদের উদ্যোগে নাটোরের পিটিআই মোড়ের দক্ষিণ দিকে শংকরভাগ গ্রামের মালেকার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তখন দীন মোহাম্মদের বয়স প্রায় ৮০ বছর। বিয়ের পর নতুন স্ত্রীকে নিয়ে নাটোরের শান্তাহারে প্রায় তিন বছর থাকার পর আবারও ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় শহর রাজশাহীর শিরোইল কলোনীতে। ততদিনে নিজের বাড়ি-ভিটা বলতে কিছুই ছিল না তাঁর। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি আশ্রয় নেন মো. মনসুর আলীর বাড়িতে, যার ঠিকানা ৫৮০, শিরোইল কলোনী, ৪ নম্বর গলি। এরই মধ্যে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভেঙে পড়ে তাঁর শরীর। জীবন-জীবিকার তাগিদে একসময় যে মানুষটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন, শেষ বয়সে সেই মানুষটিকেই অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। মনসুর আলী তাঁর কাছ থেকে কোনো বাড়িভাড়া নিতেন না। সাধ্য অনুযায়ী খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থাও করতেন। এভাবেই প্রায় আট বছর মনসুর আলীর বাড়িতে কাটে দীন মোহাম্মদের জীবন। প্রায় ২০১১ সালের দিকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে নাটোরে নিয়ে যান। এরপর অসুস্থতার খবর পেয়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়া আগের পরিবারের একজন ছেলে দীর্ঘদিন পর তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। সেটিই ছিল পাকিস্তান চলে যাওয়ার পর আগের পরিবারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের অন্যতম শেষ স্মৃতি। এর মাত্র এক বছর পর, ২০১২ সালে শতাধিক বছর বয়সে নাটোরে মৃত্যুবরণ করেন দীন মোহাম্মদ। দীন মোহাম্মদের দ্বিতীয় স্ত্রী মালেকা তখন ৫৫ বছর বয়সী। তাঁদের কোনো সন্তান ছিল না। বাবা-মাও নেই। বর্তমানে তিনি ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন বলে জানা গেছে। তাঁর জীবনও অনেকটা অসহায়ত্বের মধ্যেই কাটছে। শিশুদের ভালোবাসতেন দীন মোহাম্মদ শিরোইল কলোনীর দীর্ঘদিনের বিস্কুট-সিগারেট ব্যবসায়ী মো. কামরুদ্দিনের স্মৃতিতে দীন মোহাম্মদ ছিলেন শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল একজন মানুষ। তাঁর ভাষ্য, দীন মোহাম্মদ শিশুদের মতিমালা বিক্রি করার পাশাপাশি তাদের স্কুলে যেতে উৎসাহিত করতেন। তাঁর নিজেরও ইচ্ছা ছিল কোনো একটি স্কুলে ঘণ্টাবাদকের চাকরি করার। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি। রাজশাহীর এক সময়ের অতি পরিচিত এই চরিত্র আজ নেই। নেই তাঁর বাঁশের লাঠির আগায় ঝুলে থাকা মতিমালা, নেই শিশুদের সঙ্গে তাঁর সেই হাসি-ঠাট্টা। রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি—আর এক মানুষ, যিনি হাজারো শিশুর শৈশবের আনন্দের অংশ হয়েও নিজের শেষ জীবনটা কাটিয়েছেন নিঃসঙ্গতা ও অসহায়ত্বের মধ্যে। দৈনিক রাজশাহীর শীর্ষ সংবাদ |