
চারঘাট,প্রতিনিধি:
রাজশাহীর চারঘাটে বিএনপি নেতাকর্মীরা এক সাংবাদিককে বেধড়ক মারপিট করে হত্যাচেষ্টা চালিয়েছেন। হামলার আগে দৈনিক দিনকালের চারঘাট প্রতিনিধি শাহিনুর রহমান সুজনকে ফোনে হাত কেটে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে গালাগাল করেছেন এক বিএনপি নেতা।
বুধবার ১ এপ্রিল দুপুর থেকে রাত নয়টার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। আহত সাংবাদিক সুজন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
একটি সরকারি মাদ্রাসায় অবৈধ পুকুর খনন এবং মাটি লুটের সংবাদ প্রকাশের জের ধরে এসব ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিক সুজন বুধবার রাতে চারঘাট মডেল থানায় পাঁচ বিএনপি নেতাকর্মী এবং এক আওয়ামী লীগ নেতার ছেলের নাম উল্লেখ করে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, সাংবাদিক সুজনের ওপর হামলাকারীরা সকলেই চারঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পৌরসভার সাবেক মেয়র জাকিরুল ইসলাম বিকুলের ঘনিষ্ঠ অনুসারী।
অভিযোগে যাদের নাম উল্লেখ রয়েছে, তারা হলেন- চারঘাট পৌরসভা বিএনপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি আলমগীর হোসেন (৪৮), সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম মনি (৪০), হৃদয় ইসলাম (২৬), আশিক ইসলাম (২৫) এবং মো. রকি (৩৪)। এদের মধ্যে হৃদয় উপজেলা বিএনপির সভাপতি বিকুলের একান্ত সহকারী এবং আশিক তার গাড়ির চালক। হামলাকবারীদের অন্যতম রকি বিএনপি না করলেও বিকুলের সাথে থাকেন। রকির বাবা কামরুল ইসলাম পৌরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
চারঘাটের স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, গত এক সপ্তাহ থেকে চারঘাট পৌরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর ও মনির নেতৃত্বে উপজেলার ভায়ালক্ষীপুর সরকারি মাদ্রাসায় অবৈধভাবে রাতের আঁধারে পুকুর খনন শুরু হয়। পুকুরের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছিল। মাটি বহনে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে এলাকার সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেড়েছে জনদুর্ভোগ। এলাকাবাসি এ ঘটনায় বাধা দিতে গেলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা অস্ত্র নিয়ে তাদের ভয়ভীতি দেখান।
এ ঘটনায় গত বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুরে ‘রাতের আঁধারে সরকারি মাদ্রাসার মাটি লুট’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করেন সাংবাদিক সুজন। সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি অবগত হয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাতুল করিম মিজান সেখানে অভিযান চালান। এসময় সেখানে উপস্থিত বিএনপি নেতাকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। সহকারী কমিশনার ঘটনাস্থলে থাকা দুটি এক্সকেভেটর (মাটি খননকারী যন্ত্র) মেশিন অকেজো করেন।
এ ব্যাপারে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাতুল করিম মিজান বলেন, সংশ্লিষ্টরা পুকুর সংস্কারের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আদৌ সেটি পুকুর নয়। এটি নিচু জমি। ফসল ফলে। একারণে পুকুর কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তারপরেও তারা আইনলঙ্ঘন করে পুকর কাটছিলেন। পুকুরের মাটি বাইরে বিক্রি করছিলেন। মাটি বাইরে বিক্রির বিধান নেই। এর সকল প্রমাণ আছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই আমরা সেখানে অভিযান চালিয়েছি। এসময় ঘটনাস্থলে খননকারীরা ছিলেন না। একারণে খনন কাজে ব্যবহার করা দুটি এক্সকেভেটরের ব্যাটারি বিনষ্ট করে মেশিন দুটি অকেজো করা হয়েছে।
এদিকে অভিযান শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাতুল করিম মিজান চলে যাওয়ার পর সন্ধ্যার দিকে বিএনপি নেতা মনি ফোনে সাংবাদিক সুজনকে অশ্লীল গালাগাল করেন। এসময় মনি প্রাণনাশের হুমকি দেন। সুজনের হাত কেটে নেওয়ার কথা বলেন। পরে ওই বিএনপি নেতা মনির সাথে ভয়েস রেকর্ডটির কথপোকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন সাংবাদিক সুজন। তিনি ভয়েস রেকর্ড প্রকাশ করে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এরপর রাত নয়টার দিকে চারঘাট পৌরসভা সদরের শহীদ মিনার এলাকার একটি চায়ের স্টলে বসেছিলেন সাংবাদিক সুজন। এসময় তার ওপর হামলা চালান বিএনপি নেতা মনি এবং আলমগীরের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা। তারা বাঁশের এবং কাঠের লাঠি দিয়ে সুজনকে বেধড়ক পেটান। স্থানীয়রা এগিয়ে গেলে বিএনপি নেতাকর্মীরা সেখান থেকে সরে যান। এরপর সুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আহত সাংবাদিক সুজন বলেন, সংবাদ প্রকাশের কারণে আমাকে টার্গেট করে হামলা করা হয়েছে। এখনো প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছি। আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি। থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, হামলাকারীরা আমার কাছ থেকে দৈনিক দিনকালের আইডি কার্ড, পেশাগত কাজে ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন এবং নগদ তিন হাজার ২০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। যাওয়ার সময় তারা আমাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, সাংবাদিকতা না ছাড়লে প্রাণে মেরে ফেলব।
সাংবাদিকের ওপর হামলা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, মন্তব্য করে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকিরুল ইসলাম বিকুল বলেন, সাংবাদিকের ওপর হামলা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। আমি এটি সমর্থন করতে পারি না। সাংবাদিকদের সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। সকলের সাথেই আমার সুসম্পর্ক। আমি ঘটনার পর আহত সাংবাদিক সুজনের সাথে কথা বলেছি। হামলার সাথে যেসব নেতাকর্মী জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে অচিরেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ব্যাপারে চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির উদ্দিন তুহিন জানান, অভিযোগ পাওয়ার পরই ঘটনাটির তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার সতত্যা পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চারঘাট-বাঘা আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাইদ চাঁদ বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
