
আশিকুর রহমান, রাজশাহী: তীব্র তাপদাহ ও হঠাৎ আর্দ্রতার ওঠানামায় রাজশাহীতে গাছেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কাঁচা ও আধা পাকা লিচু। ফলে বাজারে তোলার আগেই ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন চাষিরা।
চাষিদের ভাষ্য, কয়েক দিনের টানা গরমের পর হঠাৎ আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় লিচুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। খোসা দ্রুত প্রসারিত ও সংকুচিত হওয়ায় ফল ফেটে যাচ্ছে। এতে একদিকে ফলের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলায় ৫২৮ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৭৬৮ টন। চলতি মৌসুমে আবাদ কিছুটা কমে ৫২৬ হেক্টরে দাঁড়ালেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৭৫ টন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
হিসাব অনুযায়ী, গড়ে প্রতি কেজিতে প্রায় ৪০টি লিচু ধরে ১০০টি লিচুর ওজন হয় প্রায় আড়াই কেজি। আর ১০০ লিচুর গড় মূল্য ধরা হয়েছে ৪০০ টাকা। সেই হিসেবে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের লিচুর ব্যবসার সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্যে দেখা যায়, গত কয়েক দিনে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে, আবার কখনো তা নেমেছে ৩৪ ডিগ্রির ঘরে। একই সময়ে আর্দ্রতা কখনো ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। তবে পুরো সময়জুড়ে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মাটির আর্দ্রতার ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন আবহাওয়ায় লিচুর খোসা দ্রুত ফুলে ওঠে আবার সংকুচিত হয়। এই চাপ সহ্য করতে না পেরে ফল ফেটে যায়। বিশেষ করে তীব্র গরমের পর হঠাৎ আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেলে এই সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করে।
পবা উপজেলার লিচুচাষি হান্নান বলেন, “এ বছরের মতো এমন পরিস্থিতি আগে দেখিনি। কয়েক দিন আগেও প্রচণ্ড গরমে মাটি শুকিয়ে গিয়েছিল। এখন হঠাৎ আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় লিচুর খোসা ফেটে যাচ্ছে। অনেক গাছে অর্ধেকের বেশি লিচুই নষ্ট হয়ে গেছে। আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বড় লোকসানের মুখে পড়ব।”
গোদাগাড়ী উপজেলার চাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, “লিচু চাষে খরচ অনেক বেশি। কিন্তু এখন যেভাবে ফল নষ্ট হচ্ছে, তাতে খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়বে। বৃষ্টি না থাকায় সেচ দিচ্ছি, কিন্তু আর্দ্রতার তারতম্যে গাছের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে পুরো মৌসুমই ঝুঁকিতে পড়বে।”
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন সরাসরি ফল চাষে পড়ছে। অস্বাভাবিক আবহাওয়ায় লিচুর মতো সংবেদনশীল ফল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “লিচু অত্যন্ত সংবেদনশীল ফল। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সামান্য পরিবর্তনেও এর ওপর প্রভাব পড়ে। এ বছর আবহাওয়ার যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তা লিচুর জন্য অনুকূল নয়। আমরা কৃষকদের নিয়মিত হালকা সেচ ও গাছের গোড়ায় মালচিং করার পরামর্শ দিচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘ সময় শুকনো থাকার পর হঠাৎ অতিরিক্ত পানি পেলেই ফল ফেটে যেতে পারে। তাই সেচ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রাখা জরুরি। এখনো সময় আছে—সঠিক পরিচর্যা করলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। তবে আবহাওয়া আরও অস্থির হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
