
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের পলাশী গ্রামের আদর্শ কৃষক সাজেদুর রহমান প্রায় তিন দশক ধরে কৃষি খামার পরিচালনা করে আসছেন।
চলতি মৌসুমে ১২০ বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একই জমিতে আমন চাষের উদ্যোগ নিলেও এখন তিনি পড়েছেন নতুন সংকটে—সারের সংকটে।
সাজেদুর রহমান অভিযোগ করেন, এলাকায় ডিলারদের দোকানে সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে। তার মতো একই সমস্যায় ভুগছেন এলাকার অধিকাংশ কৃষক।
তিনি জানান, সরকারি দাম ১ হাজার টাকা হলেও কয়েকদিন আগে খুচরা দোকান থেকে এক বস্তা ডিএপি সার ১ হাজার ৭৫০ টাকায় কিনতে হয়েছে। অথচ প্রতি মাসেই রাজশাহীতে বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারদের বিপুল পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই সার ডিলারদের দোকানে না পাওয়া গেলেও আশপাশের হাট-বাজারের খুচরা দোকানে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে সারের কালোবাজারি চললেও অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার মিলছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মার্চ মাসের বরাদ্দ সার ইতোমধ্যে উত্তোলন ও বিক্রি শেষ হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, ডিলারদের দোকানে তারা সার পাচ্ছেন না, অথচ একই সার খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এপ্রিল মাসে ৮৯ জন বিসিআইসি ডিলারের জন্য ১২৫ মেট্রিক টন এবং বিএডিসির ১২১ ডিলারের জন্য ৪৮৩ মেট্রিক টন টিএসপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিসিআইসির ডিলারদের জন্য ৬৪৬ মেট্রিক টন ও বিএডিসির ডিলারদের জন্য ১ হাজার ২১৮ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১ হাজার ১৭১ মেট্রিক টন এমওপি সার বরাদ্দ রয়েছে। মার্চ মাসেও প্রায় একই পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিলারদের দোকানে টিএসপি ও ডিএপি সার গত দুই সপ্তাহ ধরেই পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ আমন মৌসুমের চারা রোপণের আগে প্রতি বিঘায় ৩০ থেকে ৪০ কেজি ডিএপি সার প্রয়োজন হয়। স্থানীয় কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা না পেয়ে কৃষকরা বাধ্য হয়ে কালোবাজারের ওপর নির্ভর করছেন।
পলাশী গ্রামের কৃষক আনোয়ার জানান, সরকারি দাম ১ হাজার টাকা হলেও ডিএপি সার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭৫০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। তানোর উপজেলার কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, এ দুই উপজেলার কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তার অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে ডিলাররা সার সরবরাহ করলেও সাধারণ কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। অসাধু ডিলারদের সঙ্গে কিছু কৃষি কর্মকর্তার যোগসাজশে কাগজে-কলমে সার বিক্রির হিসাব দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাজশাহীর উপকণ্ঠ চব্বিশ নগরের এক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, দামকুড়া হাটের ইসলাম ট্রেডার্সে কখনোই সার পাওয়া যায় না। জেলা সার ডিলার সমিতির এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। তবে তারা সার তুলে কী করছে, তা স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে জেলা শাখা বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম বলেন, উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটিতে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। কোনো অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তার দাবি, বর্তমানে রাজশাহীতে সারের কোনো সংকট নেই।
অন্যদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং চড়া দামে বিক্রির বিষয়েও তাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তারা নিয়মিত ডিলারদের গুদাম মনিটরিং করছেন বলেও জানান তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
