
নিজস্ব প্রতিনিধি
আষাঢ় শেষ, শ্রাবণও পাঁচ দিন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠে এখনো দেখা মেলেনি বর্ষার চিরচেনা রূপ। বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর থাকার কথা যে কৃষিজমিগুলোর, সেগুলোর অনেকটিতেই এখন চলছে গভীর নলকূপের সেচ। ফলে আমন মৌসুমে কৃষকদের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টির অনিয়মিত প্রবণতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার হোসেনপুর মৌজার মহাডাঙ্গা গ্রাম, গেরস্ত পৌর এলাকার হরিপুর মহল্লা এবং নাচোল উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর মৌজা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, কোথাও সেচ দিয়ে কাদা তৈরি করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিকেরা আমনের চারা রোপণে ব্যস্ত। তবে প্রায় সব কৃষকই বলছেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভর করেই আবাদ করতে হচ্ছে।
হরিপুর মহল্লার কৃষক মোহাম্মদ নাসিম বলেন, “ছয় বছর আগে আমার জমিতে গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। তখন থেকেই প্রতিবছর নলকূপের পানি ছাড়া আমনের আবাদ সম্ভব হচ্ছে না। আগে আষাঢ় শেষ হওয়ার আগেই অর্ধেকের বেশি জমিতে চারা রোপণ শেষ হয়ে যেত। এবার শ্রাবণের পাঁচ দিন পার হলেও ১০ শতাংশ জমিরও আবাদ হয়নি।”
নাচোল উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম জানান, এবার তিনি ১০ বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করছেন। এর মধ্যে ছয় বিঘায় সম্পূর্ণ সেচের পানি ব্যবহার করতে হয়েছে। বাকি চার বিঘায় কিছুটা বৃষ্টির পানি মিললেও সেচ দিতে হয়েছে। প্রতি বিঘায় সেচ বাবদ ৬২৫ টাকা, শ্রমিক খরচ প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং চারা রোপণসহ অন্যান্য কাজে আরও প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় হয়েছে।
একই এলাকার আরেক কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, “চাষের খরচ দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু ধানের দাম সে অনুযায়ী বাড়ে না। সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারব কি না, তা নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে। লাভ কম হলেও বিকল্প না থাকায় ধান চাষ করতেই হচ্ছে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে গড় বৃষ্টিপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমন আবাদে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, “স্বাভাবিকের তুলনায় এ বছর বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তাই কৃষকদের সেচের পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এবার জেলায় ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে।”
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টির অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফলে আমন চাষে গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীলতা যেমন বাড়ছে, তেমনি কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।