
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার দাবিতে জনগণের এক ঐতিহাসিক প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের যে অঙ্গীকার সেই আন্দোলন জন্ম দিয়েছিল, দুই বছর পর এসে তার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সর্বশেষ জরিপ সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষের পরিমাণ বৃদ্ধি, দুর্নীতির অভিজ্ঞতার হার বেড়ে যাওয়া এবং অভিযোগ করেও প্রতিকার না পাওয়ার আশঙ্কা—এসব তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকটের প্রতিচ্ছবি।
বাস্তবতা হলো, সরকার পরিবর্তন অপেক্ষাকৃত সহজ; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি পরিবর্তন অনেক কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির মতো সমস্যাগুলো রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয় না। সেগুলো ভাঙতে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং ধারাবাহিক সংস্কার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে ইতিহাস একটি বিরল সুযোগ এনে দিয়েছিল। জনগণের বিপুল সমর্থন ও নৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও আলোচনায় উঠে এসেছে, সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো প্রশাসনিক ধারা নতুন বাস্তবতাতেও বহাল থেকেছে।
ছাত্র নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা প্রতিনিধিদের প্রতিও মানুষের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। তারা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন—এমন বিশ্বাস ছিল সাধারণ মানুষের। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় তাদের ঘিরেও বিভিন্ন বিতর্ক, অনিয়ম ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা বিচার করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হলেও, এসব বিতর্ক জনগণের প্রত্যাশাকে নিঃসন্দেহে ক্ষুণ্ন করেছে।
এটিও সত্য যে, কোনো অন্তর্বর্তী সরকার রাতারাতি দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির কাঠামো ভেঙে দিতে পারে না। কিন্তু জনগণ সরকারকে মূল্যায়ন করে কেবল ঘোষণার ভিত্তিতে নয়; বরং পরিবর্তনের দৃশ্যমান অগ্রগতির ভিত্তিতে। সেখানেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে।
বর্তমান সরকারের জন্যও এই বাস্তবতা একটি বড় সতর্কবার্তা। রাজনৈতিক বৈধতা টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বা প্রশাসনিক রদবদল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, সরকারি সেবার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব এবং আইন প্রয়োগে বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করা।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে—জনগণ অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। কিন্তু সেই আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে, তার নৈতিক শক্তি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা বদলাতে পারে তার ওপর। রাজনৈতিক পরিবর্তন যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ না নেয়, তবে জনগণের আশা ধীরে ধীরে হতাশায় পরিণত হবে, আর রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস আরও দুর্বল হবে।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সরকারকে তাদের ভাষণের জন্য নয়, তাদের রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্মরণ করে। তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—জুলাইয়ের চেতনা কি কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হয়ে উঠবে?
সাংবাদিক সানোয়ার আরিফ
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক রাজশাহীর শীর্ষ সংবাদ।