
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা এলাকায় নিজেকে কখনও এমবিবিএস চিকিৎসক, আবার কখনও সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডা. এম রহমান নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে বৈধ সনদ ছাড়াই আলট্রাসনোগ্রাফিসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডা. এম রহমান নাম ব্যবহার করলেও তার প্রকৃত নাম মুহাম্মাদ মুখলেসুর রহমান। রাজশাহী মহানগরের ষষ্টিতলা এলাকায় তার পৈতৃক বাড়ি হলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি নওহাটা এলাকায় অবস্থান করছেন। সেখানে তিনি “নওহাটা ইসলামী জেনারেল হাসপাতাল” নামে একটি বেসরকারি ক্লিনিক পরিচালনা করছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা পাঞ্জাবি ও টুপি পরিহিত এক ব্যক্তি আলট্রাসনোগ্রাফি করছেন এবং গাইনি সংক্রান্ত বিষয়ে রোগীর সঙ্গে আলোচনা করছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তি নিজেকে ডা. এম রহমান হিসেবে পরিচয় দেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই ক্লিনিকে তিনি নিজেই রোগী দেখেন, প্রেসক্রিপশন লিখেন, আলট্রাসনোগ্রাফি করেন এবং এমনকি অপারেশনের মতো জটিল চিকিৎসাও পরিচালনা করেন। বিশেষ করে নারী রোগীদের চিকিৎসায় তার সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের একজন মোমেনা (ছদ্মনাম) জানান, গত ৩০ জানুয়ারি চিকিৎসা নিতে গিয়ে তিনি নির্ধারিত ফি প্রদান করেন। পরে ডা. এম রহমান নিজেই তার আলট্রাসনোগ্রাফি করেন এবং প্রেসক্রিপশন দেন। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরেক নারী আফরোজা (ছদ্মনাম)। তিনি অভিযোগ করেন, চিকিৎসার সময় তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করা হয় এবং স্পর্শকাতর স্থানে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করা হয়।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, আলট্রাসনোগ্রাফির সময় তাকে ব্যক্তিগত ও বিব্রতকর প্রশ্ন করা হয়, যা তাকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে। ঘটনার পর তিনি আর ওই ক্লিনিকে যাননি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার ব্যবহৃত ভিজিটিং কার্ড, প্রেসক্রিপশন প্যাড ও সিলমোহরে ‘ডা.’ এবং ‘MBBS’ উল্লেখ রয়েছে। তবে তার চিকিৎসা শিক্ষার কোনো বৈধ সনদ বা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) নিবন্ধনের তথ্য নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে ক্লিনিকে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি সাংবাদিকদের হাসপাতালে আসতে বলেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকরা তার সনদপত্র দেখতে চাইলে তিনি দাবি করেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সিভিল সার্জন কার্যালয়ে জমা রয়েছে। তবে তিনি কোনো নথি প্রদর্শন করতে পারেননি। আলট্রাসনোগ্রাফির অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। পরে ভিডিও দেখানো হলে বিষয়টি নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা সেবার মতো সংবেদনশীল খাতে ভুয়া পরিচয়ে কার্যক্রম পরিচালনা রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। বিষয়টি দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) আইন, ২০১০-এর ধারা ২৯ অনুযায়ী, নিবন্ধন ছাড়া নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দেওয়া বা চিকিৎসা প্রদান করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
এছাড়া ভুয়া পরিচয়ে অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪১৯ ও ৪২০ ধারায় মামলা হতে পারে। এসব ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, “ঈদের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও দেখেছি। ঈদের পর বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সরবরাহের আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে রাজশাহীর সিভিল সার্জন জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে লিখিত অভিযোগ বা প্রমাণ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।