
মো: নুরে ইসলাম মিলন : বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত-এই দুই স্তম্ভই একটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ গঠনের মূল ভিত্তি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই দুই খাতে অব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলার অভাব এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিবেদন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসা অসংখ্য ঘটনার পর্যালোচনায় স্পষ্ট-ডিউটির সময় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মনোযোগ বিচ্যুতি, বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতা, সেবার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী যেখানে চিকিৎসক-রোগীর একটি নির্দিষ্ট অনুপাত থাকার কথা, সেখানে বাংলাদেশে সেই অনুপাত বহু ক্ষেত্রে অসম। ফলে একজন চিকিৎসকের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে, যা সেবার মানকে প্রভাবিত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিউটির সময় অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যবহার, যার ফলে রোগী পর্যবেক্ষণ, জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রোগীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে-এমন অভিযোগ বহু ক্ষেত্রে উঠে এসেছে।
শিক্ষাঙ্গনের চিত্রও ভিন্ন নয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে শিক্ষকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ক্লাস চলাকালীন মোবাইল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মনোযোগে প্রভাব ফেলছে এবং শিক্ষার পরিবেশকে দুর্বল করছে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ যেখানে গড়ে ওঠে, সেই শিক্ষাঙ্গনে এই ধরনের অবহেলা দীর্ঘমেয়াদে গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।
এই সামগ্রিক বাস্তবতার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর সাম্প্রতিক ঘটনা। গতকাল সেখানে ইন্টার্নি ডাক্তারদের কর্মবিরতির কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জরুরি বিভাগসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা পাননি, অনেককে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। এতে করে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
তবে এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে ইন্টার্নি ডাক্তাররা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতা, অপ্রতুল ভাতা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং পেশাগত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসকদের ওপর হামলা বা হুমকির ঘটনাও ঘটেছে, যা তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে কর্মবিরতি তাদের দাবির বহিঃপ্রকাশ হলেও, তা যখন জরুরি সেবাকে স্থবির করে দেয়, তখন তা সরাসরি জনস্বার্থের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।
আইনগত ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে অত্যাবশ্যক সেবার আওতায় ধরা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ কর্মবিরতি বা দায়িত্বে অবহেলা সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। একইভাবে শিক্ষাঙ্গনে দায়িত্বে অবহেলা একটি প্রজন্মের জ্ঞানগত ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। মোবাইল ফোন আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হলেও, এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কর্মক্ষেত্রে মনোযোগহীনতা তৈরি করছে। চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো সংবেদনশীল খাতে তাই ডিউটির সময় ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। জরুরি যোগাযোগ বা পেশাগত প্রয়োজনে সীমিত ব্যবহার থাকতে পারে, তবে বিনোদনমূলক বা অপ্রাসঙ্গিক ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন।
সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, চিকিৎসক ও ইন্টার্নদের ন্যায্য দাবি দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে তাদের কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে দায়িত্বে অবহেলা বা শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত ও প্রতিকার করা যায়। তৃতীয়ত, জরুরি সেবা অব্যাহত রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা-যেমন রোস্টারভিত্তিক ডিউটি বা ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করার বিধান-প্রণয়ন করা যেতে পারে।
সবশেষে, একটি বিষয় অনস্বীকার্য-স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে দায়িত্বে অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি মানবিক সংকট। রোগীর জীবন এবং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ-এই দুইয়ের সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই। তাই এখনই সময় কঠোর, বাস্তবসম্মত এবং মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার-যেখানে দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতাই হবে সবার আগে।
