
রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্য উদঘাটন, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরাই সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংবাদিকতার আড়ালে অপেশাদারিত্ব, দালালি, চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের একটি অংশের কাছে পুরো গণমাধ্যমই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।প্রায়ই দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে “সাংবাদিক পরিচয়ধারী” কিছু ব্যক্তি চাঁদাবাজি, প্রতারণা, মাদক ব্যবসা কিংবা তদবির বাণিজ্যের অভিযোগে আটক হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার প্রচার জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। অথচ বাস্তবতা হলো—এদের বড় একটি অংশ পেশাদার সাংবাদিক নন; বরং সাংবাদিকতার পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।
বাংলাদেশে অনলাইন গণমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার একদিকে যেমন তথ্যপ্রবাহকে সহজ করেছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন ও অনিবন্ধিত প্ল্যাটফর্মের সংখ্যাও বাড়িয়েছে। এখন খুব সহজেই একটি নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল খুলে পরিচয়পত্র তৈরি করা যায়। নেই কোনো কার্যকর যাচাই-বাছাই, নেই ন্যূনতম পেশাগত মানদণ্ড। ফলে সাংবাদিকতার মতো স্পর্শকাতর পেশায় অযোগ্য ও অসাধু ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ বেড়েছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব খাটানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রহের চেয়ে “ম্যানেজমেন্ট” ও “তদবির” বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মান ও বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রকৃত সাংবাদিকদের বাস্তবতাও সুখকর নয়। দেশের বহু সংবাদকর্মী অল্প বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক চাপের মধ্যে কাজ করেন। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার অভাবও সাংবাদিকতার মানকে প্রভাবিত করছে। এই দুর্বল কাঠামোর সুযোগ নিয়েই একটি অসাধু গোষ্ঠী সাংবাদিকতার আড়ালে ব্যক্তিস্বার্থের বাণিজ্য গড়ে তুলেছে। তবে সবকিছুর পরও আশার জায়গা রয়েছে। এখনও দেশে অনেক সাহসী ও পেশাদার সাংবাদিক আছেন, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্নীতি, মাদক, মানবপাচার ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করছেন। তাদের কারণেই সমাজের বহু অন্ধকার দিক জনগণের সামনে উঠে আসছে। তাই কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজকে দায়ী করা কখনোই ন্যায়সঙ্গত নয়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা, সাংবাদিকদের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি, পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং নৈতিকতা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও আত্মসমালোচনায় যেতে হবে এবং পেশার মর্যাদা রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা। কারণ জনগণের আস্থা হারালে সংবাদমাধ্যম আর সমাজের দর্পণ হয়ে উঠতে পারে না। তাই সময়ের দাবি—সাংবাদিকতার নামে দালালি ও অপরাধ নয়, বরং সত্য, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের চর্চা নিশ্চিত করা।
সাংবাদিক সানোয়ার আরিফ
দৈনিক রাজশাহীর শীর্ষ সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক।
