
রাজশাহী থেকে নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)-এর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তরের উদ্যোগ ঘিরে জনমনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি আঞ্চলিক ভারসাম্য, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং একটি অঞ্চলের আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি যে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে—যেখানে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, টি-বাঁধ, আই-বাঁধ, পদ্মা গার্ডেন, আম চত্বর এমনকি বারোরাস্তার বিমানও বগুড়ায় নিয়ে যাওয়ার ‘দাবি’ জানানো হয়েছে—তা নিছক হাস্যরস নয়; বরং গভীর ক্ষোভের প্রতীক।
রাজশাহী উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, শিক্ষাবিষয়ক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক বা প্রধান কার্যালয় গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে না; বরং কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবা গ্রহণ, আবাসন, পরিবহন এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণকে উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নির্ধারণে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে সেবার দক্ষতা, ভৌগোলিক সুবিধা, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিলে তার প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য সুফল, ব্যয়, জনস্বার্থ এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ওপর প্রভাব—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।
নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়ে যদি বাস্তবিক কোনো প্রশাসনিক বা কারিগরি প্রয়োজন থাকে, তবে সেই কারণ জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা উচিত। একই সঙ্গে রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সেবার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কেও একটি স্বাধীন মূল্যায়ন প্রকাশ করা প্রয়োজন। কারণ তথ্যের ঘাটতি থাকলে গুজব, অসন্তোষ ও অবিশ্বাস বাড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদটি দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষ কেবল একটি ভবন হারানোর আশঙ্কা করছে না; তারা মনে করছে, ধীরে ধীরে রাজশাহীর প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব কমে যেতে পারে। এই মনস্তাত্ত্বিক উদ্বেগকে অবহেলা করা উচিত নয়। জনগণের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সরকারের উচিত হবে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ—জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা করা। যদি স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা যৌক্তিক হয়, তবে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। আর যদি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকে, তবে আঞ্চলিক ভারসাম্য ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ব্যঙ্গের ভাষা অনেক সময় প্রতিবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা হয়ে ওঠে। নেসকো ইস্যুতে রাজশাহীবাসীর এই প্রতিক্রিয়া সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক সংলাপ; বিরোধ নয়, যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান বদলানো সহজ হলেও, একটি অঞ্চলের মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা অনেক বেশি কঠিন।