গণপিটুনিতে ২৮, রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭; ৪৫ সাংবাদিকসহ নির্যাতনের শিকার শত শত মানুষ
মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: এইচআরএসএস
নিজস্ব প্রতিবেদক : আগস্টে দেশে গণপিটুনি, রাজনৈতিক সংঘাত, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনায় মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সংগঠনটির মাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার অন্তত ৫৩টি ঘটনায় ২৮ জন নিহত এবং ৬২ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৭০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জনের বেশি।
বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় বেড়েছে হতাহত
এইচআরএসএসের হিসাবে, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাইয়ে ৪৫টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ১৬৪ জন আহত হলেও আগস্টে ৭০টি ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ জনে। আহত হন ৫৩৬ জনের বেশি।
আগস্টে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২০টি ঘটনায় ৫ জন নিহত ও অন্তত ১৫২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৮টি সংঘর্ষে একজন নিহত ও ২৩৩ জন আহত হন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সাতটি সংঘর্ষে একজন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে ছয়টি সংঘর্ষে ১৬ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১০টি ঘটনায় ৩৮ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে আরও নয়টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭১ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত সাতজনের মধ্যে বিএনপির পাঁচজন, আওয়ামী লীগের একজন এবং জামায়াতে ইসলামীর একজন রয়েছেন।
ক্যাম্পাসেও সংঘাত
ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘর্ষের অন্তত ১৩টি ঘটনায় ২১৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ছাত্রদল ও শিবিরের আটটি সংঘর্ষে ১৮১ জন এবং ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঁচটি ঘটনায় ৩৫ জন আহত হন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা, দলীয় ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় হামলা, গুলিবর্ষণ, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
অন্তত ১৯টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত ১২ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী।
৬২টির বেশি মামলা, গ্রেপ্তার ১২ হাজার ৮২৩
আগস্টে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ৬২টির বেশি মামলা হয়েছে বলে দাবি করেছে এইচআরএসএস। এসব মামলায় ১ হাজার ১২৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও প্রায় ২ হাজার ২০৯ জনকে।
রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ১৬২টি ঘটনায় ১২ হাজার ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪২৯ জন, বিএনপির ২২ জন, জামায়াতে ইসলামীর চারজন, এনসিপির নয়জন এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের পাঁচজন সদস্য রয়েছেন।
গণপিটুনিতে প্রাণ গেল ২৮ জনের
চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগসহ নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে আগস্টে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার অন্তত ৫৩টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও ৬২ জন আহত হয়েছেন।
নির্যাতন-হয়রানির শিকার ৪৫ সাংবাদিক
আগস্টে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির অন্তত ৩২টি ঘটনায় ৪৫ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬ জন আহত, ছয়জন লাঞ্ছিত এবং সাতজন হুমকির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া পাঁচ সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
সংবাদ প্রকাশের জেরে করা একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর আওতায় করা আরেকটি মামলায়ও একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৩টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৬১ জন আহত ও আটজন আটক হন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের আটটি ঘটনায় ১০ জনকে আটক এবং আটটি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার ২৪৯
আগস্টে ২৪৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ৪৬ জন অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।
এ ছাড়া ১৮ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৯৩ জন, যাঁদের মধ্যে ৩৮ জন শিশু।
যৌতুকের কারণে নির্যাতনে ছয়জন নারী নিহত, সাতজন আহত এবং একজন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতায় ৪৯ জন নিহত, ৩১ জন আহত এবং ২৩ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন।
নির্যাতনের শিকার ২৮২ শিশু, প্রাণ গেল ৭৭ জনের
আগস্টে ২৮২ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ২০৫ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
অন্যদিকে শ্রমিক নির্যাতনের অন্তত ৮৪টি ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও কমপক্ষে ৬৭ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৩ জন শ্রমিক মারা গেছেন।
এ ছাড়া পৃথক দুটি ঘটনায় দুজন গৃহকর্মীর মৃত্যু এবং একজন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সীমান্তেও প্রাণহানি
আগস্টে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে আটটি ঘটনায় বিএসএফের হামলায় দুজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পাঁচজনকে পুশইন করা হয়েছে এবং আরও ১৮ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন বাংলাদেশি যুবক নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। জলসীমা থেকে তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার ৮৭ লাশ
আগস্টে দেশের বিভিন্ন নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৮২টি ঘটনায় ৮৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস।
উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে ১২টি বস্তাবন্দী, ১৭টি ঝুলন্ত এবং ২৬টির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ছাড়া নয়টি গলাকাটা এবং আটটি হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ১৫টি লাশ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পাওয়া যায়।
এদিকে আগস্টে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ছয়জন আসামির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন কয়েদি ও পাঁচজন হাজতি ছিলেন।
‘মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক’
সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, আগস্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সরকারকে জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
Rahman Moti