বিশেষ অনুসন্ধান-রাজশাহী
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার শলুয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য শাহাবুর আলী (৪২) ওরফে শাহাবুর মেম্বারকে ঘিরে মাদক কারবার, অস্ত্র প্রদর্শন, সহিংসতা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের একের পর এক অভিযোগ উঠছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে তিনি আত্মগোপনে থাকলেও তাঁর ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে এলাকায় কথিত মাদক নেটওয়ার্কের কার্যক্রম চলছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—একাধিক মামলার তথ্য ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথা সামনে আসার পরও তিনি কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে?
প্রাপ্ত তথ্য ও স্থানীয়দের বক্তব্যে এমন প্রশ্ন উঠলেও শাহাবুর আলীকে ‘মাদক গডফাদার’ হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। একইভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নথিতে কী পাওয়া যাচ্ছে?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শাহাবুর আলীর বিরুদ্ধে রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, ফেনী ও পুঠিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
পবা থানা: ২০১৫ সালের একটি মাদক মামলা; এজাহারে শাহাবুর আলীর নাম রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানা, সিরাজগঞ্জ: ২০০৯ ও ২০১১ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের হওয়া দুটি মামলায় তাঁর নাম থাকার তথ্য রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানা: ২০২০ সালের একটি মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
চারঘাট থানা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের একটি মামলা: অভিযোগপত্র দাখিল এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির তথ্য রয়েছে বলে জানা গেছে।
পুঠিয়া, ফেনী ও নাটোর: মাদকসহ অন্যান্য আইনে মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এসব মামলার বর্তমান অবস্থা—কোনটি বিচারাধীন, কোনটিতে জামিন হয়েছে, কোন মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর রয়েছে—তা সংশ্লিষ্ট আদালত ও থানার নথি থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ওয়ারেন্ট থাকলে গ্রেপ্তার কোথায়?
স্থানীয়দের প্রধান প্রশ্ন এখানেই। একাধিক মামলার তথ্য থাকার পরও শাহাবুর আলী দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে না থাকায় তাঁর গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আত্মগোপনে থেকেও তিনি ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাঁদের দাবি, এলাকায় মাদক সরবরাহের একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেখানে ইয়াবা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো মাদক কেনাবেচা হয়।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে তাঁকে কোনো মাদক সিন্ডিকেটের নেতৃত্বদাতা হিসেবে নিশ্চিত করেনি।
সীমান্ত থেকে রাজশাহী—মাদক সরবরাহের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদক রাজশাহীতে আনা হয়। পাশাপাশি কক্সবাজার থেকে ইয়াবা এনে রাজশাহী অঞ্চলে সরবরাহের একটি নেটওয়ার্ক থাকার কথাও দাবি করেছেন কয়েকজন স্থানীয়।
তাঁদের দাবি, কথিত এই নেটওয়ার্কে পরিবহনকারী, বিক্রেতা ও সহযোগীসহ একাধিক ব্যক্তি যুক্ত রয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি বা তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো স্থানীয়দের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
অস্ত্রের অভিযোগও কম নয়
মাদক কারবারের অভিযোগের পাশাপাশি শাহাবুর মেম্বারের বিরুদ্ধে অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি সৃষ্টি ও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি একটি অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পাওয়াকে কেন্দ্র করে অস্ত্র নিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর তাঁকে ইউপি সদস্য পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলেও তাঁরা দাবি করেন।
তবে এ ঘটনার সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হাতে না পাওয়া পর্যন্ত অভিযোগটির পূর্ণ সত্যতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
আধিপত্যের দ্বন্দ্বে প্রাণ গেল শাহবাজের
চারঘাটের তাতারপুর ও কারিগরপাড়া এলাকায় মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের বিরোধের কথা স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
২০২২ সালের মার্চে দুই পক্ষের সংঘর্ষে শাহবাজ আলী নামে একজন নিহত হন। স্থানীয়দের কেউ কেউ ওই বিরোধের সঙ্গে মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি যুক্ত বলে দাবি করেছেন।
তবে ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শাহাবুর আলী বা তাঁর কথিত নেটওয়ার্কের সরাসরি সম্পৃক্ততা আদালত বা পুলিশের নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
বানেশ্বরের ব্যবসা ঘিরেও প্রশ্ন
চারঘাটের বানেশ্বর বাজারে একটি খাবারের হোটেলকে ঘিরেও শাহাবুর মেম্বারের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্রের অবৈধ ব্যবসার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
তাঁদের দাবি, বৈধ ব্যবসার আড়ালে অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য মামলা, আদালতের নথি কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্পদের উৎস কোথায়?
শাহাবুর আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
তাঁদের দাবি, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তার উৎস খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের মতে, অভিযোগের সত্যতা থাকলে সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে আয়কর নথি, ভূমি রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শুধু শাহাবুর নয়, সহযোগীদেরও চায় এলাকাবাসী
এলাকাবাসীর দাবি, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কথিত নেটওয়ার্কের সঙ্গে কারা জড়িত, কারা মাদক পরিবহন ও বিক্রি করে এবং কারা অর্থের জোগান দেয়—তাদের শনাক্ত করা জরুরি।
একই সঙ্গে মাদক ও অস্ত্রের অভিযোগের পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পুলিশের বক্তব্য কী?
রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় খোঁজ নিতে হবে আমাকে। তারপর আমি বিস্তারিত বলতে পারব। আমাদের সিডিএম চেক করে দেখতে হবে তাঁর বিরুদ্ধে কতগুলো মামলা রয়েছে। বর্তমানে কী অবস্থা, কোন মামলায় ওয়ারেন্ট রয়েছে—সবকিছু জানার পরে বলতে পারব।”
অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপ
শাহাবুর আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট থানার মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, আদালতের আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং মামলার বর্তমান অবস্থা যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য ভূমি রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি থেকে যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
শাহাবুর আলীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর অবস্থানও প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
সুতরাং এখন মূল প্রশ্ন একটাই—মামলা ও অভিযোগের এই দীর্ঘ তালিকার পরও শাহাবুর মেম্বার কোথায়, আর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আইনি পদক্ষেপগুলোর বর্তমান অবস্থাই বা কী?
Sanwar Arif