
মো: নুরে ইসলাম মিলন :-
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি, যার প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে আমাদের ঘরোয়া আচরণেও। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই সংকট অতীতের বড় বড় জ্বালানি বিপর্যয়কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) ইতোমধ্যেই বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিহাসের অন্যতম বড় সরবরাহ সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব এখন জ্বালানি নিরাপত্তার এক অভূতপূর্ব ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রভাব স্থানীয় পর্যায়েও গভীরভাবে পড়ছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও বাজারের অস্থিরতার কারণে অনেকেই ভবিষ্যতের শঙ্কা থেকে ঘরে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুদ করতে শুরু করেছেন। কিন্তু এই প্রবণতা, যা অনেকের কাছে সাময়িক নিরাপত্তার কৌশল বলে মনে হতে পারে, বাস্তবে তা একটি বড় ধরনের জননিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
জ্বালানি তেল—পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল কিংবা কেরোসিন—দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপাদান হলেও এগুলোর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত দাহ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব পদার্থের সংরক্ষণে সামান্য অসতর্কতা যে কত বড় বিপর্যয়ের জন্ম দিতে পারে, তা অতীতের অসংখ্য দুর্ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আবাসিক ঘরে অবৈধ ও অনিরাপদভাবে জ্বালানি তেল মজুদের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।
একটি পরিবারের ঘরে রাখা অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কেবল সেই পরিবারের জন্য নয়, বরং পুরো মহল্লার জন্য একটি অদৃশ্য বিপদের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। অগ্নিকাণ্ডের জন্য বড় কোনো কারণের প্রয়োজন হয় না—একটি ক্ষুদ্র স্পার্ক, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট কিংবা সামান্য অসাবধানতাই যথেষ্ট একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার সূচনা করতে। বিশেষ করে আবদ্ধ পরিবেশ, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং বৈদ্যুতিক সংযোগের কাছাকাছি দাহ্য পদার্থ রাখার ফলে ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
ফায়ার সার্ভিস সংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসিক এলাকায় জ্বালানি মজুদ একটি “সাইলেন্ট হ্যাজার্ড”—যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। একবার আগুন লাগলে এসব দাহ্য পদার্থ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে, ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টিতেও বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অবৈধভাবে বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে প্রয়োজনবোধে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এটি কোনোভাবেই অবহেলা করার মতো বিষয় নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণ আমাদের অসচেতনতা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব। অনেকেই মনে করেন, অল্প পরিমাণে জ্বালানি মজুদে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তবে সেই ‘অল্প’ পরিমাণই একটি বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, যেখানে একটি ছোট দুর্ঘটনাও দ্রুত বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমা কোথায়? নিজের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে যদি অন্যের জীবন ও সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তবে তা নিঃসন্দেহে দায়িত্বহীনতা। সমাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়; প্রতিটি নাগরিকেরও নৈতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সতর্কবার্তা প্রদান করেছে, যা সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। তবে শুধু সতর্কবার্তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং সর্বোপরি কার্যকর জনসচেতনতা গড়ে তোলা। স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সিটি কর্পোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
গণমাধ্যম এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব, যা মানুষকে দায়িত্বশীল আচরণে উদ্বুদ্ধ করবে। পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগে এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
পরিশেষে বলা যায়, সামান্য অবহেলা কখনো কখনো ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার, দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলার। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলা—এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। সচেতনতা হোক আমাদের অভ্যাস, নিরাপত্তা হোক অগ্রাধিকার।
লেখক :
মো: নুরে ইসলাম মিলন
যুগ্ম-সম্পাদক
রাজশাহী প্রেসক্লাব।
সভাপতি
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, রাজশাহী বিভাগ।
