ঢাকা | বঙ্গাব্দ

এক এলাকায় চার শিশুকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা, আতঙ্কে রাজশাহীর অভিভাবকেরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 3, 2026 ইং
এক এলাকায় চার শিশুকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা, আতঙ্কে রাজশাহীর অভিভাবকেরা ছবির ক্যাপশন:
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় শিশু-কিশোরদের অপহরণের চেষ্টার একাধিক অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পারিলা ইউনিয়নেই অন্তত চার শিশু-কিশোরকে বিভিন্ন কৌশলে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাদের অভিভাবকেরা। সর্বশেষ গত রোববার একই দিনে দুই শিশুকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, কখনো মাইক্রোবাসে এসে ছুরি দেখিয়ে, কখনো মোটরসাইকেলে এসে হাত ধরে বা চোখে স্প্রে করে, আবার কখনো অভিভাবক পাঠিয়েছে—এমন পরিচয় দিয়ে শিশুদের নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে এক কিশোরকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের উদ্দেশ্য কী—তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মাইক্রোবাসে এসে ছুরি দেখিয়ে তামিমকে নেওয়ার চেষ্টা
সর্বশেষ রোববার দুপুরে কাটাখালী থানার নওদাপাড়া এলাকায় তামিম হোসেন (১১) নামে এক শিশুকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা সাদ্দাম হোসেন কাটাখালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়, দুপুরে বাড়ির পাশের পুকুরে গোসল করতে যাচ্ছিল তামিম। এ সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন ব্যক্তি নেমে ছুরি দেখিয়ে তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তামিম দৌড়ে স্থানীয় ফেনু নামের এক ব্যক্তির কাছে আশ্রয় নিলে ওই ব্যক্তিরা মাইক্রোবাস নিয়ে পালিয়ে যান।
সাদ্দাম হোসেনের দাবি, প্রায় তিন বছর আগেও নওদাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠসংলগ্ন এলাকা থেকে একইভাবে তার ছেলেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।
মোটরসাইকেলে এসে চোখে স্প্রে
একই দিন সকালে পারিলা উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় মাহির শাহরিয়ার (১১) নামে ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মাহিরের বাবা সবুজ ইসলাম জানান, স্কুলে অনুষ্ঠান থাকায় সকাল ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে বাড়ি থেকে বের হয় তার ছেলে। বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি তার ছেলেকে থামান। মোটরসাইকেল চালক মাহিরের হাত ধরেন এবং পেছনে থাকা ব্যক্তি তার চোখে স্প্রে করেন।
এ সময় মাহির দৌড়ে একটি বাড়ির গলিতে ঢুকে পড়ায় তাকে নিয়ে যেতে পারেনি তারা। চোখে স্প্রে করার কারণে ঘটনার পরও তার চোখ লাল হয়ে ছিল বলে জানান বাবা। তবে এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ করেননি তিনি।
‘তোমার আব্বু পাঠিয়েছে’—তারপরও রক্ষা
প্রায় ২১ দিন আগে পারিলা গ্রামে আরাফাত নামে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকেও অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার বাবা নীলবর আলী।
তার ভাষ্য, স্কুল ছুটির পর দুপুর আড়াইটার দিকে বাড়ি ফিরছিল আরাফাত। এ সময় অ্যাপাচি মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি তাকে বলেন, ‘তোমার আব্বু আমাদের নিতে পাঠিয়েছে, গাড়িতে চলো।’
বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আরাফাত মোটরসাইকেলে ওঠেনি। পরে তাকে জোর করে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে সে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
নীলবর আলী জানান, বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পবা ও কাটাখালী থানা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত ঘটনার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি জানতে পারেননি বলে দাবি তার।
বৈদ্যুতিক শক দিয়ে কিশোরকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ
এরও আগে প্রায় দুই মাস আগে তরফপারিলা গ্রামের কিশোর আসাদুল্লাহ গালিবকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তার বাবা শফিউর রহমান।
তিনি জানান, এশার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে চার ব্যক্তি ইলেকট্রিক গান দিয়ে গালিবকে শক দেন। এরপর তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে গালিব দৌড়ে পালিয়ে বাড়ির সামনে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। বিষয়টি কাটাখালী থানায় জানানো হলেও মামলা করেননি বলে জানান শফিউর রহমান।
অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ
একই এলাকায় পরপর এ ধরনের অভিযোগ ওঠায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকেরা। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মুর্শেদ বলেন, তিনিও এসব ঘটনার কথা শুনেছেন। সর্বশেষ তামিমকে অপহরণের চেষ্টার খবর পাওয়ার পর গ্রাম পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্যকে তার বাড়িতে যেতে বলেছেন।
অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ, চলছে তদন্ত
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মতিন বলেন, শিশু অপহরণের চেষ্টার বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই এবং থানায় লিখিত অভিযোগও পাওয়া যায়নি।
তবে রোববার একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন কাটাখালী থানার ওসি মো. নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনাটি রহস্যজনক হওয়ায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
আরএমপির মুখপাত্র উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, একই এলাকায় একাধিক শিশুকে অপহরণের চেষ্টার বিষয়টি তার জানা নেই। থানায় অভিযোগের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে।
অপরাধের কৌশল বদলানোর ইঙ্গিত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, সামাজিক অস্থিরতা, ব্যক্তিগত স্বার্থ, পারিবারিক ও সামাজিক পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে অপরাধের ধরন ও মাত্রায় পরিবর্তন আসতে পারে।
তিনি বলেন, সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে অপরাধীরাও নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনাগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি অপরাধের ধরন ও সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এদিকে, পরপর কয়েকটি অভিযোগ সামনে আসায় পারিলা ও আশপাশের এলাকায় শিশুদের চলাফেরায় সতর্কতা বাড়িয়েছেন অভিভাবকেরা। তবে ঘটনাগুলোর পেছনে একই চক্র রয়েছে কি না, কিংবা আদৌ পরিকল্পিত অপহরণচেষ্টার সঙ্গে এসব ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না—তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : Rahman Moti

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
দুপুরে রাজশাহী আসছেন প্রধানমন্ত্রী, বিকেল ৩টায় জনসভা

দুপুরে রাজশাহী আসছেন প্রধানমন্ত্রী, বিকেল ৩টায় জনসভা